প্রথম টেস্ট জয় বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। আনন্দে ভাসছে সারা দেশ , হতাশায় অস্ট্রলিয়া ক্রিকেট দল। …




ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে জয়ের অন্যতম নায়ক সাকিব। 

রোমাঞ্চকর ঢাকা টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। জয়ের জন্য ২৬৫ রানের লক্ষ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ওয়ার্নার-স্মিথরা গুটিয়ে গেল ২৪৪ রানে। সাকিব আল হাসান নিয়েছেন ৫ উইকেট। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো টেস্টে ১০ উইকেট তুলে নিলেন তিনি। গতকাল তৃতীয় দিন শেষ ২ উইকেটে ১০৯ রান তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া। আজ দিনের প্রথম ঘণ্টায় ওয়ার্নার-স্মিথ জুটি ৬৫ রান তুলে ফেলে ম্যাচ থেকে বাংলাদেশকে প্রায় ছিটকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যাহ্ন বিরতির আগের ঘণ্টায় বাংলাদেশ ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচে ফেরে। সাকিব ফেরান ওয়ার্নার-স্মিথ ও ওয়েডকে। বিরতির পর সাকিবের বলেই ফেরেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। সাকিবের ৫ উইকেটের পাশাপাশি তাইজুল নিয়েছেন ৩ উইকেট, মিরাজ ২টি। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ ১১২ রান ওয়ার্নারের। স্মিথ করেছেন ৩৭, প্যাট কামিন্স ৩৩ রানে অপরাজিত থাকেন।

ঢাকা টেস্ট শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে কেউ একজন এই ম্যাচকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। সেটা শুনে অনুযোগ জানিয়েছিলেন অধিনায়ক মুশফিক। বাংলাদেশ কোনো টেস্ট খেললেই কেন সেটা ‘ঐতিহাসিক’ হয়ে যাবে! জিততে হবে তো… অবশেষে ঐতিহাসিকই বনে গেলো রোমাঞ্চকর ঢাকা টেস্ট। অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে স্বাগতিক বাংলাদেশ সিরিজে এগিয়ে গেলো ১-০ ব্যবধানে। সেই সাথে দূর হল সিরিজ হারের শঙ্কা, ঠিক একই কারণে বেঁচে আছে সফরকারীদের হোয়াইটওয়াশ করার স্বপ্নও।

লো-স্কোরিং ইনিংস দেখে ঢাকা টেস্টের পঞ্চম দিন দেখার আশা দর্শকেরা ছেড়ে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় দিনেই। অনেকে শুরু করেছিলেন হিসেবনিকেশ- ঠিক কোন সেশনে গিয়ে থামবে পেন্ডুলামের মতো দোলায়মান এই ম্যাচ। অবশেষে ঢাকা টেস্ট থামল ১১তম সেশনে। চতুর্থ দিনের লাঞ্চ বিরতি শেষে খেলোয়াড়েরা আবার যখন ড্রেসিংরুমে ফিরছেন, বাংলাদেশ তখন এই ম্যাচের জয়ী দল।

 

টেস্ট ক্রিকেটকে যারা ম্যাড়মেড়ে বিনোদন বলে আখ্যায়িত করতে চান, তাদের গালে চপটাঘাত করতে পারে এই ঢাকা টেস্ট। একদম প্রথম সেশন থেকে রোমাঞ্চ জাগিয়ে শুরু, শেষ সেশনে এসেও রোমাঞ্চ ছড়াল পরতে পরতে। সাকিব-তামিম-মুশফিকরা বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়লেও ম্যাচ শেষের পাঁচ মিনিট আগ পর্যন্তও জয়ের গন্ধ পুরোপুরি লাগেনি তাদের নাকে। অস্ট্রেলিয়ার মাটি কামড়ে উইকেটে পড়ে থাকার চেষ্টা, টেলএন্ডারদের দৃঢ়তা, আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্ত… এই ম্যাচ দেখে কত ক্রিকেট বোদ্ধার আঙুলের নখ যে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে- কে জানে!

এবড়োখেবড়ো নখগুলোর পক্ষ থেকে নালিশ আসতে পারে সাকিব আল হাসানের নামে। অস্ট্রেলিয়া যখনই ম্যাচটিতে একটু হাসার সুযোগ নিয়েছে, তখনই বীরদর্পে সেই সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছে সাকিবের অতিমানবীয় পারফরমেন্স। ঢাকা টেস্টকে মৌসুমের অন্যতম রোমাঞ্চকর টেস্ট ম্যাচ বানিয়ে ফেলতে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের অবদান তাই অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে স্বাগতিক টপ অর্ডার যখন ছেলেমানুষির পরিচয় দিচ্ছিলেন, বন্ধু তামিমকে তখন যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন ব্যাটটাকে তলোয়ার বানিয়ে। ঐদিনই গড়েছিলেন অনন্য একটি রেকর্ড, যাতে পেছনে ফেলেছেন কিংবদন্তী অলরাউন্ডারদের। প্রথম ইনিংসে সম্মানজনক সংগ্রহের পর (যদিও সেটিই ম্যাচের সেরা ইনিংস!) বল হাতে প্রয়োজন ছিল অসাধারণ কিছুর, তাতে সফরকারীদের আটকানো যাবে বাংলাদেশের চেয়েও কম রানে। সেই অসাধারণ কিছু সাকিব করে দেখিয়েছেন সবগুলো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকারের বিরল কীর্তি গড়ে।

ম্যাচের চার ইনিংসের মধ্যে তৃতীয় ইনিংসেই কেবল ম্লান ছিলেন সাকিব। উড়িয়ে মারতে গিয়ে তালুবন্দি হওয়ার পর সাজঘরে সাকিবের ফিরে যাওয়া দেখে মুখ খুলেছিলেন সাকিবের সমালোচকেরাও। বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে ঐ উইকেটের যে দায় ছিল বেশ! তবে সেই দায় সাকিব মেটালেন, এবারও বল হাতে।

প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও সাকিবের শিকার করা উইকেটের সংখ্যা পাঁচ। এমন অনন্য কীর্তি গড়ে ৩০ বছর বয়সী অলরাউন্ডার বেশ সার্থকতার সাথে ভেঙে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মনোবল। সেই সাথে সফরকারীদের ব্যাটিং লাইনআপকে তাসের ঘরের মতো গুড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও সৃষ্টি করেছিলেন। যদিও শেষদিকে বাঁধ সাধেন অস্ট্রেলিয়ার টেলএন্ডাররা।

তবে বাংলাদেশের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে নিতে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছেন অজি ক্রিকেটাররাও। তাতে সাকিবের আক্রমণাত্মক বোলিংই রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। টেস্ট ফরম্যাটে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার হারানোর পেছনে সাকিবের ভূমিকাটাও তাই এই প্রতিবেদনে তার আধিক্যের মতো- ব্যাপক!

 

639 total views, 3 views today

Comments

comments